নিজস্ব প্রতিনিধি:আগরতলা: জন্মের পর থেকেই খাবার গিলতে পারছিল না শিশুটি। এমনকি নিজের লালাও গিলতে পারছিল না সে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ধরা পড়ে বিরল জন্মগত ত্রুটি—ইসোফেজিয়াল অ্যাট্রেসিয়া (Esophageal Atresia) এবং ট্র্যাকিওইসোফেজিয়াল ফিস্টুলা (Tracheoesophageal Fistula)। অত্যন্ত জটিল এই শারীরিক সমস্যার কারণে শিশুটির স্বাভাবিকভাবে খাবার গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছিল না। পাশাপাশি শ্বাসনালী ও খাদ্যনালীর অস্বাভাবিক সংযোগের কারণে পাকস্থলীর তরল ফুসফুসে প্রবেশ করার আশঙ্কাও ছিল। ফলে শিশুটির শ্বাসকষ্টের সমস্যা দেখা দেয়।এই কঠিন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মাত্র তিন দিনের শিশুটির জটিল অস্ত্রোপচার সফলভাবে সম্পন্ন হয়। অস্ত্রোপচারের পর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে শিশুটি। বর্তমানে সে খাবার খেতে পারছে এবং তার ওজনও বাড়তে শুরু করেছে। চিকিৎসকদের আশা, আর কিছুদিন পর্যবেক্ষণ ও নিবিড় পরিচর্যার পর শিশুটিকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া সম্ভব হবে।চিকিৎসকদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই বিরল জন্মগত ত্রুটিতে শিশুটির খাদ্যনালীর একটি অংশ অনুপস্থিত ছিল। অন্যদিকে, খাদ্যনালীর নিচের অংশের সঙ্গে শ্বাসনালীর অস্বাভাবিক সংযোগ তৈরি হয়েছিল। এর ফলে খাবার পাকস্থলীতে পৌঁছানোর স্বাভাবিক পথটি বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। এই ধরনের সমস্যার ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারই মূল চিকিৎসা।শিশুটির রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন শিশু চিকিৎসক ও নিওনেটোলজি দলের সদস্যরা। চিকিৎসক শিবাজী দাসের নেতৃত্বে দলটি প্রথমে শিশুটির শারীরিক উপসর্গ দেখে এই বিরল রোগের সন্দেহ প্রকাশ করে। পরবর্তী সময়ে এক্স-রে-সহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় নিশ্চিত করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, জটিল রোগের ক্ষেত্রে সঠিক সময়ে রোগটি সন্দেহ করা এবং দ্রুত নির্ণয় করতে পারা চিকিৎসার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।এরপর পেডিয়াট্রিক্স বিভাগ, সিটিভিএস সার্জারি বিভাগ, অ্যানেস্থেসিয়া বিভাগ এবং নিওনেটোলজি দলের সদস্যরা একসঙ্গে বসে অস্ত্রোপচারের পরিকল্পনা করেন। অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি শিশুটির অপারেশন-পরবর্তী নিবিড় পরিচর্যা নিয়েও বিশেষ পরিকল্পনা করা হয়।চিকিৎসক জানান, মাত্র তিন দিনের শিশুর অস্ত্রোপচার করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ছিল। শিশুটির শ্বাসনালীতেও ত্রুটি থাকায় অ্যানেস্থেসিয়া দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট চিকিৎসক রিমঝিম চাকমা এবং চিকিৎসক মনিময় এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা ধরে চলে অস্ত্রোপচার। বুকের মাধ্যমে অস্ত্রোপচার করে প্রথমে শিশুটির খাদ্যনালী শনাক্ত করা হয় এবং খাদ্যনালীর পুনর্গঠন করা হয়, যাতে খাবার গিলে তা পাকস্থলীতে পৌঁছাতে পারে। পাশাপাশি শ্বাসনালীর সঙ্গে খাদ্যনালীর অস্বাভাবিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে শ্বাসনালীরও পুনর্গঠন করা হয়। শিশুটির অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অত্যন্ত ক্ষুদ্র হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়াটিই ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও জটিল।অস্ত্রোপচারের পর শিশুটিকে এনআইসিইউতে রেখে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। পেডিয়াট্রিক্স ও নিওনেটোলজি বিভাগের চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ধীরে ধীরে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হতে থাকে। বর্তমানে শিশুটি নিজে খাবার গ্রহণ করতে পারছে এবং ওজনও বাড়ছে।চিকিৎসক অস্ত্রোপচার সফল হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করে জানান, এই সাফল্য কোনও একজন চিকিৎসকের একক প্রচেষ্টা নয়; বরং বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্মিলিত উদ্যোগের ফল। তিনি আশা প্রকাশ করেন, শিশুটি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে।উল্লেখ্য, এই ধরনের জটিল অস্ত্রোপচারের অভিজ্ঞতা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের আগে থেকেই রয়েছে। তিনি জানান, ত্রিপুরার একটি বেসরকারি হাসপাতালে এ ধরনের একাধিক অস্ত্রোপচার করেছেন। পাশাপাশি আগেও আইজিএম হাসপাতালে একই ধরনের একটি অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল।মাত্র তিন দিনের এক নবজাতকের বিরল জন্মগত ত্রুটি নির্ণয় থেকে শুরু করে সফল অস্ত্রোপচার এবং পরবর্তী পরিচর্যা—সমস্ত ক্ষেত্রেই চিকিৎসকদের সমন্বিত প্রচেষ্টা এক আশার আলো দেখিয়েছে। এই সাফল্য শুধু শিশুটির পরিবারের জন্যই নয়, রাজ্যের চিকিৎসা পরিষেবার ক্ষেত্রেও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।